fbpx

নেইমারের সুবাদেই শেষ আটে ব্রাজিল

গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর নেইমারই প্রথম গোলের খাতা খোলেন।

৫১ মিনিটে গোলমুখ ঘেঁষে বেরিয়ে যাওয়া মুখে বল ঠেলে দেন জালে। দ্বিতীয় গোলটাও প্রায় একই রকম। ৮৮ মিনিটে ফিরমিনোর ট্যাপ ইন। এবার বল বাড়িয়েছেন নেইমার। তাতেই শেষ আট নিশ্চিত ব্রাজিলের।

নেইমারের কাছে এ ম্যাচে অনেক আশা ছিল। সবার আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন এই ফরোয়ার্ডই। নেইমার হতাশ করেননি, ড্রিবলিং করেছেন, গোলের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন, ফাউলের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ব্রাজিলের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনার কাজটাও করেছেন। এনে দিয়েছেন মহামূল্যবান এক গোল, করিয়েছেন আরেকটি। নেইমার আর ফিরমিনোর গোলে ২-০-তে জিতে মেক্সিকোকে আরেকটি শেষ ষোলোর পরাজয় উপহার দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে চলে গেল ব্রাজিল

থিয়াগো সিলভা আগেই বলেছিলেন, আজ হবে নেইমার-ঝলক। ক্লাবের দুই সতীর্থ কাভানি-এমবাপ্পে যে লক্ষ্যমাত্রাটা বেশ উঁচুতে তুলে দিয়েছেন জোড়া গোল করে। মেক্সিকোর বিপক্ষে নেইমারও দুটি গোল পেতে পারতেন। ম্যাচে ব্রাজিলের প্রথম ভালো সুযোগটি পেয়েছেন নেইমারই। পঞ্চম মিনিটে হঠাৎ করেই বদ্ধ দুয়ার খুলে দিল মেক্সিকোর রক্ষণ। ওচোয়ার সামনে অবারিত ফাঁকা মাঠ পেয়ে গেলেন নেইমার। এমন সুযোগ বুঝে বেশ জোরে একটা শট নিয়েছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফুটবলার।

জোরে নিতে গিয়েই হয়তো লক্ষ্যটা ঠিক স্থির করতে পারেননি। সেটা একদম ওচোয়া বরাবরই গেল। পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ সব সেভ করা ওচোয়া চোখ বন্ধ করেও সেই বল গ্লাভসে পুরে নিতে পারতেন। ২৫তম মিনিটের নেইমার বরং মুগ্ধ করেছেন বেশি। বাঁ প্রান্ত দিয়ে দারুণ এক মায়াবী আঁকাবাঁকা দৌড়ে মেক্সিকান রক্ষণে ত্রাস ছড়ালেন। একবার ডানে তো একবার বাঁয়ে করে ফাঁক বের করে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে যে পাস দিলেন, সেটা ওচোয়ার গ্লাভসের ছোঁয়া নিয়ে নির্বিষ এক আক্রমণে রূপ নিল।

নেইমারের এই দুই সুযোগের আগে-পরে মেক্সিকোই খেলল মাঠে। ব্রাজিলকে চাপে রেখে একের পর এক আক্রমণ করেছে দলটি। হিরভিং লোজানো, সালসেদো কিংবা হেক্টর হেরেরারা ডি-বক্স পর্যন্ত দুর্দান্ত খেলেও মূল কাজটা করতে পারছিলেন না। কখনো বাজে শট খেলে কখনোবা সতীর্থদের সঠিক সময়ে পাস না দিয়ে সুযোগ হাতছাড়া করেছে মেক্সিকো।

নেইমারের ২৫ মিনিটের ওই দৌড়ের পরই ব্রাজিল ফিরে পেয়েছে নিজেদের। নেইমার-কুতিনহো-উইলিয়ানরা আক্রমণে মন দিলেন। জেসুসও ইতস্তত ঘোরাঘুরি ছেড়ে আক্রমণের বাকি তিনজনের সঙ্গে রসায়নটা বাড়িয়ে নিলেন। ফলে মেক্সিকোর অর্ধেই বল থাকল বেশি। আর এতক্ষণ আক্রমণ সহ্য করে যাওয়া ব্রাজিল রক্ষণও হাঁফ ছাড়ল। কুতিনহো দারুণ সব দৌড়ে সুযোগ সৃষ্টি করছিলেন কিন্তু গিয়ের্মো ওচোয়া যে ব্রাজিলের জন্যই তাঁর সেরা খেলা জমা রাখেন! প্রথমার্ধ তাই গোলশূন্য অবস্থাতেই শেষ হলো। রেফারি গিয়ানলুক্কি রচ্চি ৪৫ মিনিটের চেয়ে এক সেকেন্ডও বাড়তি সময় কাটাতে চাইলেন না মাঠে!

ওচোয়ার সেরা খেলা দেখা গেছে দ্বিতীয়ার্ধে। কখনো ফিলিপে কুতিনহো, কখনো পাওলিনহো, কখনো উইলিয়ান, কখনোবা নেইমার—সবাইকেই হতাশা উপহার দিয়েছেন ওচোয়া। ২০১৪ বিশ্বকাপে ব্রাজিলকে প্রায় একাই রুখে দিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। ৪ বছর পর আরেক ব্রাজিল ম্যাচেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে মেক্সিকোর হয়ে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড গড়ে ফেললেন।

কিন্তু এসব রেকর্ড অর্থহীন হয়ে গেছে ৫১ মিনিটে। সেটা নেইমারের সুবাদেই। ডি-বক্সের বাইরে বল পেয়ে দারুণ এক ব্যাক হিল করলেন উইলিয়ানকে। উইলিয়ান যখন বল নিয়ে বক্সের বাঁ প্রান্তে ঢুকে গেলেন, নেইমার ততক্ষণে ডান প্রান্তে চলে গেছেন। উইলিয়ানের বাড়িয়ে দেওয়া বল ওচোয়ার গ্লাভসের সামনে দিয়ে চলে গেল। পা বাড়ালেও নাগাল পেলেন না গ্যাব্রিয়েল জেসুস। ভাগ্যিস, পাননি! নেইমার যে আগেই চলে গেছেন জায়গামতো। অনুশীলনে ছক কেটে রাখা এক সাজানো আক্রমণের মতোই নেইমারের পা ছুঁয়ে বল চলে গেছে জালে। ১-০ গোলে এগিয়ে গেল ব্রাজিল।

অথচ আগের মিনিটেই এগিয়ে যেতে পারত মেক্সিকো। দারুণ এক আক্রমণে ব্রাজিল রক্ষণের কঙ্কাল বের করে নিয়েছিলেন হেসুস গায়ার্দো। বাঁ দিকে বলের অপেক্ষায় ছিলেন লোজানো। আর সামনে মেক্সিকোর ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হাভিয়ের হার্নান্দেজ। যেকোনো একজন বল পেলেই ম্যাচে এগিয়ে যেতে পারত মেক্সিকো। কিন্তু মাঝমাঠ বল নিয়ে আসা গায়ার্দোর মহানায়ক হওয়ার ইচ্ছে জাগল। অযথা এক দূরপাল্লার শট। ব্রাজিলের গোলরক্ষক আলিসন সেই শট কোন দিকে গেল, সে চিন্তাও করতে গেলেন না।

গোলের এমন ভালো সুযোগ মেক্সিকোর বাকি ৪৫ মিনিটে আর সৃষ্টি করতে পারেনি। তবু ম্যাচে টানটান উত্তেজনাকর এক দৃশ্য দেখা গেছে ৭১ মিনিটে। ডাগআউটের কাছ দিয়ে বল বাইরে চলে গিয়েছিল। সেই বল নিয়ে আসা নিয়ে কার্লোস ভেলার সঙ্গে একটু ঠুকঠাক হলো নেইমারের। তাতেই নেইমার রীতিমতো তিনবার গড়াগড়ি খেয়ে নিলেন। বল নেওয়ার ছুতোয় মেক্সিকান খেলোয়াড়ের বুট তাঁর পায়ে লেগেছে কি না, সেটা বারবার রিপ্লে দেখেও বোঝা যায়নি। নেইমারের অমন আর্তচিৎকারও তাই রেফারিকে কোনো কার্ড বের করতে উৎসাহিত করল না।

এবারের বিশ্বকাপে তাঁর এমন গড়াগড়ি সামাজিক মাধ্যমে ট্রলের সুযোগ এনে দিয়েছে। নেইমার কিন্তু ওই নাটককে আজ আর আলোচনার কেন্দ্রে রাখার সুযোগ দেননি। ৮৮ মিনিটে প্রতি-আক্রমণে উঠল ব্রাজিল। বাঁ প্রান্তে বল নিয়ে এক ছুটে মেক্সিকান বক্সের প্রান্তে এসে বল বাড়িয়ে দিলেন নেইমার। এবারও ওচোয়া বাধা হলেন, গ্লাভসের একটু ছোঁয়া পেল বল। কিন্তু এবার সে বল ওচোয়ার সঙ্গে প্রতারণা করে ঠিকই ছোট বক্সের সামনে চলে গেল। বদলি নামা রবার্তো ফিরমিনোকে শুধু ট্যাপ ইন করতে হলো। মূল একাদশে জায়গা পাওয়ার দাবি জোরালো করে ব্রাজিলের জয় নিশ্চিত করলেন ফিরমিনো (২-০)।

নেইমারের আহত হওয়ার সেই ঘটনা কিংবা নাটকের ফলে যোগ করা সময়ের দৈর্ঘ্য বেড়ে হয়েছিল ৬ মিনিট। সেটা পুরিয়ে আরও বাড়তি এক মিনিট দিয়েছেন রেফারি রচ্চি। কিন্তু প্রথম ৯০ মিনিটে যা করতে পারেননি লোজানোরা, সেটা বাকি ৭ মিনিটেও করা হয়নি তাঁদের। আক্রমণ সাজিয়েও শেষটা তুলে নিতে না পারা। আর উল্টো ছবি ব্রাজিলের। সবচেয়ে সেরা দুই সুযোগের কোনোটাই হাতছাড়া করেনি। ওচোয়া প্রাচীর হয়ে না দাঁড়ালে সংখ্যাটা আরও বাড়ত নিশ্চিত।

তারা ঝরার এই বিশ্বকাপে ব্রাজিল কোনো অঘটন ঘটতে দিল না। যেভাবে খেলছে, তাতে ১৬ বছরের অপেক্ষা ঘোচানোর আশা আরও উজ্জ্বল হলো তাদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *